সব দাবির এক উত্তর, ‘কাল আসুন’

সব দাবির এক উত্তর, ‘কাল আসুন’

মানুষ যাতে ঠিক সময় সরকারি পরিষেবা পান, সেই উদ্দেশ্যে এ রাজ্যে চালু হয়েছে ‘জন পরিষেবা অধিকার আইন’। এখন চাই নাগরিকদের সক্রিয়তা। লিখছেন সাবির আহমেদ।

২ মার্চ , ২০১৪
e e e print

2edit3

গত বছরের শেষ দিনের কথা। শহর মাতোয়ারা বছর শেষের আনন্দে, আর সত্তর বছর বয়সি সফি চাচার পরিবার মরিয়া হাসপাতালের একটা সিট জোগাড় করতে। সকালেই পা-পিছলে পড়ে মাথায় অবিশ্রাম রক্তক্ষরণ; চিকিত্‌সার দরকার। কলকাতার এক নামী সরকারি হাসপাতালের পুরনো বিল্ডিং; ভাঙা স্ট্রেচারে চড়ে এক বার চার তলায় ওঠা আবার দোতলায় নামা। পরিবারের লোকজন হাঁসফাঁস করছে, কত তাড়াতাড়ি চিকিত্‌সা করানো যায়। সিটের জন্য বারবার অনুরোধ করায়, বিরক্ত স্বাস্থ্যকর্মীর উত্তর: ‘কাল আসুন’। আর্থিক সঙ্গতি ছিল, তাই শেষ পর্যন্ত বেসরকারি নার্সিং হোমে গিয়ে বাঁচলেন সফি চাচা। অনেকেরই সেই সৌভাগ্য হয় না। তাঁদের কপালে ‘কাল’ আসে না।

কথা হচ্ছিল উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখর-১ ব্লকের ধরমপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের ঝাড়বাড়ি সিংনাথ গ্রামের লতিফ মিঞার সঙ্গে। চার সন্তানের রেশন কার্ডের জন্য প্রথম বার আবেদন করেছিলেন ১৯৯৬ সালে, হাতে পেলেন ২০১৩’য়। মাঝের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, জুতোর সুখতলা খুইয়ে একই উত্তর পেয়েছেন: ‘কাল আসুন’।

ওই জেলারই ইটাহার ব্লকের ৫ নং পাতিরাজপুরের কোকনা গ্রামে মোলিনা যোগির চার বছরের ছেলে উঠোন জুড়ে খেলে বেড়াচ্ছে, ওর জন্মের সময়েই জননী সুরক্ষা যোজনার ৫০০ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। যোজনার টাকা সদ্যোজাত শিশুর পরিচর্যার জন্য বরাদ্দ ছিল, হাতে পেলেন ছেলের স্কুলে যাওয়ার সময়। ২০০৬ সালে মহাত্মা গাঁধী গ্রামীণ কর্ম নিশ্চয়তা প্রকল্প শুরু হলেও, জেলার কালিয়াগঞ্জ ৪ নং বোচাডাঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের অলোকা বর্মন ও সাবিত্রী রায় বর্মন, ভগবানগোলা-২ ব্লকের রিবোনা গ্রাম পঞ্চায়েতের রোকশনা বিবি, মর্জিনা বিবি, টিয়া বিবিরা ২০১১ সালেও কাজ পাননি। কাজের দাবির একটাই প্রত্যুত্তর: ‘কাল আসুন’। অবশেষে কাজ পেলেন ২০১২-১৩’য়।

বিচারবিভাগের দীর্ঘসূত্রিতা তো প্রবাদে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন হাইকোর্টে মোট ৩৭ লক্ষের কিছু বেশি মামলা চলছে। কত লোক ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলছেন জীবনের দীর্ঘ, সবচেয়ে ফলপ্রসূ সময়, সংশোধনাগার নামক পিঞ্জরে।

উদাহরণ বাড়ানো নিরর্থক। বার্থ সার্টিফিকেট, রেশন কার্ড পেতে মনে আছে কত বার ধুলোময় স্যঁাতসেঁতে অফিসগুলোয় যেতে হয়েছিল। এই লেখা প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল এ রাজ্যের প্রাক্তন এক আমলার সঙ্গে। কথায় কথায় জানালেন, আমলা জীবন শেষ হওয়ার পর থেকে ‘কাল আসুন’-এর যন্ত্রণা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন; রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, টেলিফোন বা বিদ্যুত্‌ অফিস দর্শনে। ঔপনিবেশিক যুগে শাসক ও শাসিতের মধ্যে দূরত্ব সযত্নে লালিত হত। ব্রিটিশ রাজের অবসান হলেও, শাসকীয় মানসিকতার কোনও পরিবর্তন হয়নি। তিনি আরও জানালেন, বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তা মূলত শাসন পরিচালনায় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ। প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহি নিয়ে ততটা কথা হয়নি। এই দায়হীনতাই ‘কাল আসুন’ সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পিছনে দায়ী। দ্বিতীয়ত, সরকারি চাকরি পাওয়া যত কঠিন, তার চেয়ে ঢের কঠিন চাকরি হারানো। চাকরি না খোয়ানোর সুরক্ষা কবচ দায়হীনতা বাড়িয়ে দেয়।

কাঁদুনি গাইলে সমাধান হবে না, নাগরিকদের সক্রিয়তা দরকার। চুপ করে বসে থাকেননি লতিফ  মিঞা। পুয়োরেস্ট এরিয়া সিভিল সোসাইটি সার্পোট প্রোগ্রামে জানতে পারেন তথ্য অধিকারের কথা। এই আইন প্রয়োগ করে জানতে চান, রেশন কার্ডের আবেদনপত্রের কী অগ্রগতি হল? এ প্রশ্নেই ঘায়েল আধিকারিক। কার্ড হয়ে গেল তিরিশ দিনের মাথায়। একই ভাবে এক স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা তথ্য অধিকার আইন বলে জানতে চেয়েছেন, কবে তাঁরা একশো দিনের কাজ পাবেন। পঞ্চায়েত কাজ দিতে উদ্যোগী হয়েছে।

গত নভেম্বরে এ রাজ্যে চালু হয়েছে ‘জন পরিষেবা অধিকার আইন’। ‘কাল আসুন’-এর হয়রানির পরিবর্তে মানুষ যাতে বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা ঠিক সময়ে পায়, তা সুনিশ্চিত করতে এই আইনের সূচনা। আপাতত ভূমি ও ভূমি-সংস্কার, স্কুল শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, পরিবহণ, খাদ্য ও সরবরাহ, পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন, কৃষি, সংখ্যালঘু উন্নয়ন, পুর ও নগরোন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ এবং অনুন্নত শ্রেণি দফতর প্রভৃতি বারোটি গুরুত্বপূর্ণ দফতর এই আইনের আওতায় আসছে। এখন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন রেশন কার্ড পেতে পারেন এই আইন বলে, না পেলে সংশ্লিষ্ট অফিসারের দৈনিক ২৫০ টাকা, সর্বোচ্চ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।

আইন থাকলে তার ফাঁকও থাকে; কিন্তু তথ্য অধিকার আইন বা জন পরিষেবা অধিকার আইনগুলির প্রয়োগ থেকে দেখা যাচ্ছে, সচেতন প্রয়াস থাকলে সে  ফাঁকগুলো অন্তত কম করা যায়। এইটুকু শ্রম যদি আমরা না স্বীকার করি, তা হলে শুধু সরকার ও দুর্নীতিবাজদের দোষ দিয়ে চায়ের দোকান সরগরম হতে পারে, দেশ কি এগোবে?

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা,২০ ফাল্গুন ১৪২০, বুধবার, ৫ মার্চ ২০১৪ | কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

Leave a comment

Filed under Taxi Refusal

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s