আরটিআই জরুরি , কিন্ত্ত পশ্চিমবঙ্গে কতটা সফল ?

আরটিআই জরুরি , কিন্ত্ত পশ্চিমবঙ্গে কতটা সফল ?

আইনের হাত অনেক দীর্ঘ, আবদুল লতিফ মিঞার আঠারো বছরের লড়াই শেষ হল আধ পাতার নিরীহ চিঠিতে৷ প্রতাপশালী সরকারি আধিকারিক তিনটি সহজ প্রশ্নেই ধরাশায়ী : (ক) সরকারি নিয়ম অনুসারে আবেদন করার কত দিনের মধ্যে রেশন কার্ড পাওয়া যায় ; (খ ) আমার আবেদন পত্রের বর্তমান অগ্রগতি কতখানি হয়েছে ; (গ ) কোন আধিকারিক আমার রেশন কার্ড দেওয়ার জন্য দায়িত্ব প্রান্ত ? তিরিশ দিনের মধ্যেচারটি রেশন কার্ড সরকারি কর্তা তুলে দিলেন রোগাসোগা মাঝবয়েসীমানুষটির হাতে৷

লতিফ মিঞার কাহিনি এক লহমায় শেষ৷ কিন্ত্ত এর পিছনে আছে দীর্ঘ দিনের অবজ্ঞা , অবহেলা ও অধিকার বঞ্চনার প্রতিবাদ এবং তার বিরুদ্ধে প্রায় অসম এক যুদ্ধ৷ উত্তর দিনাজপুরের , গোয়ালপোখর -১ ব্লকের ধরমপুর -১ গ্রাম পঞ্চায়তের ঝাড়বাড়ি সিংনাথ গ্রামের লতিফ মিঞার ধৈর্য ও সাহসের উপর ভর করে দেখিয়ে দিলেন কেমন ভাবে আইন দিয়ে আইনি অধিকার রক্ষা করা যায়৷ হেঁয়ালি শোনাচ্ছে ? দেখে নিতে পারি আদতে কী হয়েছিল ? উন্নয়নের সমস্ত সূচকের নিরিখে অন্য জেলার থেকে উত্তর দিনাজপুর বেশ পিছিয়ে৷ লতিফ মিঞার মতো পরিবারগুলি খাদ্য সুরক্ষার জন্য গণবণ্টন ব্যবস্থার উপর ভীষণ ভাবে নির্ভরশীল৷ আইনি ভাবে যা পাবার কথা তা পাওয়া যায় না ; যা পাওয়া যায় তাও সংসারের আর্থিক বোঝা কিছুটা হলেও কমায়৷ চার সন্তানসহ স্বামী ও স্ত্রী -কে নিয়ে ছ’জনের সংসার , ভিটেটুকুই স্বায়ী সম্পতি৷ গণবণ্টন ব্যবস্থার সুযোগ পেতে হলে রেশন কার্ডের প্রয়োজন , আর রেশন কার্ডের জন্য গত আঠারো বছর ধরে লড়াই করছেন মরিয়া আবদুল লতিফ৷ চার সন্তানের রেশন কার্ডের জন্য প্রথম বার আবেদন করেছিলেন ১৯৯৬ সালে৷ আবেদনের সাড়া মেলেনি , রেশন কার্ড-এর জন্য অফিসে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকেও লাভ হয়নি৷ পুনরায় আবেদন করেন ২০০৬-এ৷ এ বার এক স্থানীয় নেতার সাহায্য নিয়ে রেশন কার্ড অফিসের বড়োবাবুর সঙ্গে দেখা হলেও , হাতে রইল শূন্য -নিষ্ফলা কপাল৷ ২০১০ সালে আবার দরখাস্ত করলেন , আবার শুরু হল , ‘কাল আসুন ’, শেষ হল না রেশন কার্ড না পাওয়ার দীর্ঘ লড়াই৷ এর মধ্যে ছেলেরা বড়ো হয়েছে , খরচের বোঝা দ্বিগুণ হয়েছে , অথচ রেশন কার্ডের দেখা নেই৷

সম্ভাব্য সব দরজায় কড়া নেড়েও যখন কোনও সুরাহা হল না , এর মধ্যেই পুওরেস্ট এরিয়া সিভিল সোসাইটি সাপোর্ট প্রোগ্রাম -এর আওতায় নারী ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র তথ্য অধিকার নিয়ে সচেতনতা শিবিরের লতিফ মিঞা জানতে পারলেন : সরকারের কাছ থেকে ১০ টাকার কোর্ট ফিস -এর বিনিময়ে তাঁর আবেদনপত্রের কী হাল হয়েছে জানতে চাইতে পারেন৷ এল ২০১৩ সন৷ মনে হাজারও শঙ্কা ছিল৷ গ্রামের ছেলে আবদুল হালিম ভিন রাজ্যের দিনমজুর , আরটিআই -এর মাধ্যমে কী ভাবে রেশন কার্ড পেয়েছিলেন সে গল্প শোনান৷ কিছুটা আশা জাগল তথ্য অধিকার আইনের উপর৷ কপাল ঠুকে আরটিআই -এ আবেদন করে জানতে চাইলেন মাত্র তিনটি সহজ ও নিরীহ প্রশ্ন৷ ম্যাজিকের মতো কাজ হল , আবেদন করার কয়েক দিনের মধ্যে রাজকর্মচারী হাজির প্রজার দরবারে , ‘আমাদের কয়েক দিনমাত্র সময় দিন ’৷ এ বার তাঁরা কথা রেখেছেন ; দিন কয়েকের মধ্যে চার সন্তানের রেশনকার্ড হাতে পেলেন৷ চমকের আরও বাকি : লতিফ ভাইয়ের আরটিআই -এ কাজ হতে দেখে পাড়ার আরও ৫ -৭ পরিবারও আবেদনপত্র জমা দিলেন , মাস না ঘুরতেই ১৯ টি নতুন রেশনকার্ড হয়ে গেল৷

সরকারি পরিষেবা পেতে আবেদনকারীকে প্রতি দিন শুনতে হয় ‘কাল আসুন ’৷ এই ‘কাল আসা ’টা অনন্ত কালে পরিণত হয় সংশ্লিষ্ট নাগরিকের ভৌগোলিক , সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের উপর৷ কর্তব্যে ফাঁকি দেওয়াটা এক প্রকার শোষণ , কখনও বা খুবই তীব্র, বিশেষত সেই সব ক্ষেত্রে যেখানে সরকারি কর্তা বারংবার দরখাস্তকারীকে বলতে থাকেন ‘কাল আসুন ’৷

তথ্য অধিকার আইনের জোরটা এখানেই — পিছিয়ে পড়া জেলা , ব্লক, গ্রাম ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর এক সাধারণ নাগরিকের সক্ষমতার সিঁড়ি৷ যেমন ভাবে লতিফ মিঞা পেরেছেন , এই উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ ব্লকের সাবিত্রী রায় বর্মনের , ১০০ দিনের কাজ বহু বার চেয়েও যখন কাজ পাননি , তখন আরটিআই -এর শরণাপন্ন হন৷ ২০০৬ সালে মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ কর্ম নিশ্চয়তা প্রকল্প শুরু হলেও , একটা ক্ষুদ্র অংশই এই প্রকল্পের সুযোগ নিতে পেরেছিল , তার মধ্যে মহিলাদের অংশগ্রহণ নামমাত্র৷ কাজ চেয়ে এক দল মহিলা পঞ্চায়েতে আবেদন করেন , বছর কেটে গেলেও পঞ্চায়েতের কোনও হেলদোল লক্ষ্য করা যায়নি৷ অগত্যা প্রত্যয় মহিলা গোষ্ঠীর মহিলারা তথ্য অধিকার আইন বলে আবেদন করে বসলেন ; তাঁরা জানতে চাইলেন : ১০০ দিনের কাজ কবে তাঁরা পাবেন৷ আরটিআই আবেদনের ফলে অনেকেই কাজ পেয়েছিলেন৷ গণতন্ত্রকে প্রকৃত অংশগ্রহণমুখী করতে , প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা আনতে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে যে দীর্ঘ আন্দোলন চলেছিল , ২০০৫ সালে তার সুফল হিসাবে উঠে আসে৷ তথ্য অধিকার আইনের মধ্যেই ছোটো ও বড়ো দুর্নীতি দমনের বীজ বপন করা হয়েছিল , তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির অদ্ভুত নীরবতা৷ পশ্চিমবঙ্গে তথ্য অধিকার আইন অযত্নে ফাল্গুনে ঝরে যাওয়া গাছের রূপ নিয়েছে , আইনের কাঠামোটা শুধু দাঁড়িয়ে আছে৷ এ রাজ্যে তথ্য অধিকার আইন দানা বাঁধতে পারেনি বহুবিধ কারণে৷ প্রথমত , এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি অনীহার কারণে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোই গড়ে তুলতে পারেনি ; সরকারি অফিসে জন তথ্য আধিকারিককে খুঁজে পেতেই আপনার বেশ কাঠখড় পোড়াতে হবে৷ তথ্যের অধিকার আইন অনুসারে কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরে মুখ্য তথ্য কমিশনার সহ অন্তত দশ জন কমিশনার নিয়ে তথ্য কমিশন গঠন করার কথা৷ বিগত ছ’ বছরে , বেশির ভাগ সময়ই এক জন মুখ্য তথ্য কমিশনার দায়িত্বে ছিলেন৷ বর্তমানে , এক জন মুখ্য তথ্য কমিশনার ও দু’জন তথ্য কমিশনার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন৷ দেশজুড়ে তথ্য অধিকারের নানান সাফল্য , পশ্চিমবঙ্গেও আবেদনপত্রের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে , আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তথ্য না দেওয়ার সংখ্যাও৷ তথ্য না পেয়ে , আপিল ও অভিযোগ করলে , কমিশন সংশ্লিষ্ট তথ্য আধিকারিকের কাছে তথ্য না দেওয়ার জন্য কারণ জানতে নির্দেশ দিচ্ছেন , অথচ বেশির ভাগ তথ্য আধিকারিক নানান ছুতোয় তা পালন করছেন না৷ নির্দেশ লঙ্ঘন করা তথ্য আধিকারিকের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারছে কমিশনের অবহেলার জন্য৷ এই অধিকার সম্পর্কে জনসাধারণের সচেতনতা বাড়াতে রাজ্য সরকার ও তথ্য কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে৷ রাজ্য সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করার সুপারিশ করতে পারে , কিন্ত্ত , কমিশন আশ্চর্যজনক ভাবে নীরব৷ অন্য দিকে , পূর্বতন ও বর্তমান শাসকগোষ্ঠী স্বীয় সরকারের সাফল্যের খতিয়ান জানাবার জন্য বিশেষ করে নির্বাচনের আগে , অগণিত টাকা খরচ করেছে৷ অথচ , আম নাগরিকের জানার অধিকার আছে , সেটা জানাতে কানা কড়িও খরচ করেনি৷ গোপনীয়তার বেড়াজাল , সরকারি উদাসীনতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ত্র্যহস্পর্শে এই আইনটির সম্ভাবনা এ রাজ্যে নষ্ট হতে চলেছে৷ সরকারি পরিষেবা পেতে ‘কাল আসুন ’-এর মৌরসিপাট্টা ভাঙতে , এ আইনকে রাজ্যে সচল করতে প্রয়োজন গণ সক্রিয়তার৷ আশার কথা , সিভিল সোসাইটি সাপোর্ট প্রোগামের আওতায় নারী ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র ও শ্রীপুর মহিলা ও খাদি উন্নয়ন কেন্দ্র প্রভৃতি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি নিরন্তর প্রচার অভিযান চালাচ্ছে৷ এর ফলও হাতে -নাতে পাওয়া যাচ্ছে ; আবদুল লতিফের রেশন কার্ড পাওয়া হোক অথবা অলকা বর্মন বা সাবিত্রী রায় বর্মনের আরটিআই আবেদনের ফলে ১০০ দিনের কাজ নিশ্চিত হওয়া সাফ্যলের কিছু নমুনা৷ তথ্য খুলে দেবে গণতন্ত্রের নতুন দরজা ; তথ্য জানতে পারাটা শাসিতদের কাছে এক প্রকার সক্ষমতা , যা থেকে তাঁরা নিজেদের অধিকারগুলোকে সুনিশ্চিত করতে পারেন৷

Leave a comment

Filed under Taxi Refusal

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s